হাকালুকি হাওরে পাখির সংখ্যা বেড়েছে বার্ড রিংগিং পাখির সন্ধান পাওয়া যায়নি

৩০ জানুয়ারি ২০২০ অপরাধ, এম কন্ঠ স্পেশাল, কৃষি, অর্থ ও বানিজ্য, জাতীয়, বিশেষ প্রতিবেদন, ভ্রমন ও পর্যটন, মৌলভীবাজার, শীর্ষ সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম, সারাদেশ, সিলেট বার পঠিত হয়েছে

এম মছব্বির আলী/ মাহফুজ শাকিল:হাকালুকি থেকে ফিরে : এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওরে এ বছর ৫৩ প্রজাতির ৪০ হাজার ১২৬ টি জলচর পাখির সন্ধান পাওয়া গেছে, তবে এর আগে ৩৩ প্রজাতির যে ৩৭০টি পাখিকে বার্ড রিংগিং (পাখির পায়ে রিং লাগানো) হয়েছিলো এবার তার একটারও সন্ধান পাওয়া যায়নি। এমনকি ২০১০ সালে যে ১৬টি পাখির গায়ে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার লাগানো হয়েছিলো ঐ পাখিগুলোরও আর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে এবার হাকালুকিতে পৃথিবী থেকে মহাবিপন্ন বেয়ারের ভূঁতিহাস পাখি পাওয়া গেছে।
২০১৯ সালে ৫১ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৯৩১টি জলচর পাখির দেখা মিললেও এ বছর তার থেকে ২ হাজার ১৯৫টি পাখি বেশী এসেছে। তাছাড়া গত বছর ৫১ প্রজাতির পাখির দেখা মিললেও এবছর ৫৩ প্রজাতির পাখির সন্ধান পাওয়া গেছে।
২০১৮ সালে ৪৫ হাজার ১০০ ও ২০১৭ সালে ৫৮ হাজার ২৮১ প্রজাতির পাখির সন্ধান পাওয়া যায়।
এবার চকিয়া বিলে ৫ হাজার ৪৩০, চাতলা বিল ৫ হাজার ১৪০, ফুট বিল ৪ হাজার ৯৮৩ ও বালিজুরি ৩ হাজার ৩০৫ প্রজাতির পাখির সন্ধান পাওয়া যায়। সর্বমোট ৫৩ প্রজাতির ৪০ হাজার ১২৬টি জলচর পাখির সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির পাখিদের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে পিয়ং হাঁস (গ্যাডওয়াল) ৬০০০টি পাওয়া যায়।
হুমকির মুখে আছে এমন ছয় প্রজাতির পাখি পাওয়া গেছে, মহাবিপন্ন বেয়ারের ভূঁতিহাঁস, সংকটাপন্ন পাতি-ভুতিহাঁস এবং প্রায় সংকটাপন্ন মরচেরঙ ভুতিহাঁস, ফুলুরি-হাঁস ও কালামাথা-কাস্তেচরা, উত্তুরে-টিটি, উদয়ী-গয়ার। হাওরখাল বিলে বিষটোপ দিয়ে মারা পাখি পাওয়া গেছে।


হাওয়াবন্যা, কালাপানি, রঞ্চি, দুধাই, গড়কুড়ি, চোকিয়া, উজান-তরুল, ফুট, হিংগাউজুড়ি, নাগাঁও, লরিবাঈ, তল­ার বিল, কাংলি, কুড়ি, চেনাউড়া, পিংলা, পরোটি, আগদের বিল, চেতলা, নামা-তরুল, নাগাঁও-ধুলিয়া, মাইছলা-ডাক, চন্দর, মালাম, ফুয়ালা, পলোভাঙা, হাওড় খাল, কইর-কণা, মোয়াইজুড়ি, জল­া, কুকুরডুবি, বালিজুড়ি, বালিকুড়ি, মাইছলা, গড়শিকোণা, চোলা, পদ্মা, কাটুয়া, তেকোণা, মেদা, বায়া, গজুয়া, হারামডিঙা, গোয়ালজুড় হাকালুকি হাওড়ের এই ৪০টি বিলে পাখিশুমারি চলে।
হাকালুকি হাওরটি কোন উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় অরক্ষিত হাওরে বিষটোপ আর ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করায় দিন দিন অতিথি পাখির সমাগম কমছে। মৎস্য অভয়াশ্রম থাকলেও সেই অভয়াশ্রমগুলোতে শিকারিরা হানা দেয়। হাওরের ইকো সিস্টেম রক্ষায় অবিলম্বে হাওরকে উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি হাওর তীরের মানুষের।
হাওরের বিভিন্ন বিলে অবাধে বিষটোপ দিয়ে পাখি শিকার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বুধবার বড়লেখার হাওরখালে বিষটোপ দিয়ে পাখি শিকার হয়। শুমারি করার সময় বার্ড ক্লাবের সদস্যরা দেখতে পান স্থানীয় কিছু শিকারীরা কয়েকটি বস্তায় পাখি নিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি দুটি মোটরসাইকেল দিয়ে বন্দুক দিয়ে চারজন শিকারী পাখি মারতে হাওরখালে আসে। তখন বার্ড ক্লাবের সদস্যদের দেখে তারা সেখান থেকে দ্রুত চলে যায়। বিশেষ করে শিকারীদের রাখা প্ল¬াস্টিকের আবর্জনায় সয়লাভ হয়ে গেছে সমগ্র হাওর। এজন্য প্রতিবছর বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও মাছ হুমকীর মুখে পড়ছে।
২০১৫ সালের ১৮ থেকে ২৪ ফেব্র“য়ারি হাকালুকি হাওরে ৩৩ প্রজাতির ৩৭০টি পাখির পায়ে যে রিং লাগানো হয়েছিলো কিংবা ২০১০ সালের মার্চ মাসে যে ১৬টি পাখির গায়ে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার এবং ৩৪টি পাখির পায়ে রিং লাগানো হয় সে সব পাখির সন্ধান এবার পেয়েছেন কিনা প্রশ্নের জবাবে বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক বলেন, ২০১৫ সালে ৩৩ প্রজাতির ৩৭০টি পাখিগুলোকে বার্ড রিংগিং (পাখির পায়ে রিং লাগানো) হয়েছিলো এবার তার একটারও সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাছাড়া ২০১০ সালে যে ১৬টি পাখির গায়ে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার লাগানো হয়েছিলো তা ২০১১ সাল পর্যন্ত পাখিগুলো আমাদের মনিটরিংয়ে ছিলো, তারপর থেকে ঐপাখিগুলোর আর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা, পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, বেয়ারের ভূঁতিহাঁস বিশ্বে মহাবিপন্ন পাখির একটি। দেশের কোথাও এই পাখির দেখা মেলেনি। একমাত্র হাকালুকিতে এই পাখির বিশেষত্ব। চার ধরনের ভূঁতিহাঁস রয়েছে। এরা হলো মরচে রং-ভূঁতিহাঁস, বেয়ারের ভূঁতিহাঁস, ফুলুরি হাঁস ও পাতি ভূঁতিহাঁস। এগুলোর মধ্যে বেয়ারের ভূঁতিহাঁস বিপন্ন প্রজাতির। পাখি শিকারিদের নিধনযজ্ঞে কারণে হাওরে প্রজননের সুযোগ না পাওয়ায় এ পাখির সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ভূঁতিহাঁসসহ অন্যান্য প্রজাতির পাখিকে রক্ষা করতে হলে বিষটোপে শিকার বন্ধ করতে হবে এবং তা সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া হাকালুকির ফুট বিলে প্রথম বারের মত ৩টি মেটে রাজহাঁসের দেখা মেলে। এগুলো মূলত সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে বিচরণ করে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, হাকালুকি হাওরকে আন্তর্জাতিকভাবে রামসার সাইট ঘোষনার জন্য পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় থেকে রামসার সচিবালয় সুইজারল্যান্ডে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে হাকালুকি হাওরের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হবে। এতে সুরক্ষিত থাকবে হাওরের মাছ ও পাখি।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।