ভারতের শাসকগোষ্ঠী কাশ্মীরের জনগণের অধিকার হরণের চক্রান্ত করেছে, বললেন খালেকুজ্জামান

৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ জাতীয়, বিশেষ প্রতিবেদন, শীর্ষ সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম, সারাদেশ বার পঠিত হয়েছে

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান বলেছেন, ভারতের শাসক গোষ্ঠীর ধারাবাহিকতায় মোদি সরকার ভারতের বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থে ৩৭০ ধারা বাতিল করে আগ্রাসনের চূড়ান্ত রূপ দিয়েছে। ঐতিহাসিক সম্মতির মাধ্যমে স্বীকৃত সাংবিধানিকভাবে গৃহীত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ও বিশেষত্ব ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে চলে আসছিল।

শুক্রবার বিকেলে আসামের নাগরিক তালিকা (এনআরসি’র) ষড়যন্ত্র ও রোহিঙ্গা নিয়ে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দলের সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি।খালেকুজ্জামান বলেন, ভারত বিভক্তির সময় ব্রিটিশের করদ রাজ্য কাশ্মীরের রাজা ছিলেন হরি সিং। ব্রিটিশরা বলেছিলো, করদ রাজ্যগুলো স্বাধীনভাবে যেকোনো দেশের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে অথবা নিজস্ব স্বতন্ত্র অবস্থানে থাকতে পারে। এ প্রেক্ষিতে রাজা হরি সিং স্বতন্ত্র অবস্থানে থাকার ঘোষণা করেন। পরে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সহযোগে একটা আদিবাসী গোষ্ঠী কাশ্মীরে হামলা চালিয়ে একটা অঞ্চল দখল করে নেয়। এ প্রেক্ষিতে রাজা হরি সিং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর সাহায্য চান। কিন্তু নেহেরু কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত না হলে সে সাহায্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে। ওই সময় কাশ্মীরের জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ আব্দুল্লাহর পরামর্শে ভারতের সঙ্গে চুক্তি

স্বাক্ষরিত হয়, ÔInstrument of AccessionÕ নামে পরিচিত। এর পর মাউন্ট ব্যাটেন ওই চুক্তি অনুমোদন করলে ভারত সৈন্য পাঠায়।তিনি আরো বলেন, ওই চুক্তিতেও কাশ্মীরি জনগণের ইচ্ছায় কাশ্মীরের অবস্থান নির্ধারিত হওয়ার কথা উল্লেখ ছিলো। পরবর্তীতে ভারতের সংবিধান প্রণয়নের সময় কাশ্মীরের জনগণের বিশেষ অধিকারের মর্যাদা দিয়ে ৩৭০ ধারা ও ৩৫ (ক) ধারা যুক্ত করা হয়। এই বিধান অনুসারে কাশ্মীরের নির্বাচিত নেতাকে ভারতের অন্য রাজ্যের মতো মুখ্যমন্ত্রী না বলে প্রধানমন্ত্রী বলা, কাশ্মীরের নিজস্ব পতাকা ও কাশ্মীরের জমি অন্য কোনো রাজ্যের জনগণ কিনতে না পারাসহ অন্যান্য অধিকারের স্বীকৃতি ছিল। এর পর থেকে কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অনেকবার যুদ্ধ হয়েছে, যুদ্ধপরিস্থিতি চলে আসছে।ঢাকা মহানগর বাসদের আহ্বায়ক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রাজেকুজ্জামান রতন, কেন্দ্রীয় পাঠচক্রের সদস্য নিখিল দাস ও জুলফিকার আলী। সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

সমাবেশে কমরেড খালেকুজ্জামান আরও বলেন, ‘ভারতের হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার গত ৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি এবং পরবর্তীতে পার্লামেন্টের উচ্চ ও নিন্মকক্ষে বিল পাসের মাধ্যমে সংবিধানের ৩৭০ ধারা ও ৩৫ (ক) বাতিল করেছে। এর মাধ্যমে ভারত সরকার কাশ্মীরের জনগণকে দেয়া বিশেষ অধিকার খর্ব করে বাস্তবে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের আন্দোলনে শেষ পেরেক ঠুকলো।’‘উন্নয়নের ডামাডোল বাজতে থাকা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিজনিত সংকটের মাঝেই চারদিক থেকে বাহ্যিক বহুমাত্রিক সংকট ক্রমাগত চেপে আসছে। মিয়ানমার ১০/১১ লাখ রোহিঙ্গা ঠেলে দিয়েছে, ভারত আসাম থেকে কখনো ৪০ লাখ, কখনো ২০ লাখ আসাম নিবাসীকে বাংলাদেশি বলে বাংলাদেশে পাঠাতে চাইছে, চারিদিকে কাঁটাতার, ন্যায্য পানির হিস্যা বঞ্চনা, সাগরের তেল-গ্যাস লুণ্ঠনের নতুন মহড়া ইত্যাদি মিলে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, কূটনীতি ও পদক্ষেপগুলোর দৈন্যতা ও ব্যর্থতার খেসারত বহু মূল্যে দেশবাসীকে দিতে হবে। যা কাঙ্খিত ও প্রত্যাশিত ছিলো না।’

ভারতের নাগরিক তালিকা (এনআরসি) প্রসঙ্গে খালেকুজ্জামান বলেন, ‘ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে ক্রমাগত স্পষ্ট করে তুলছে, পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এরই অংশ হিসেবে আসামের নাগরিক তালিকা তৈরির উদ্যোগ। এতোদিন প্রচার করেছে, ৪০ লক্ষাধিক বাঙালি মুসলমান বাংলাদেশ থেকে ভারতের আসামে অনুপ্রবেশ করেছে। ফলে নাগরিক তালিকা করে তাদের ফেরৎ পাঠাবে। এ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আসামে দীর্ঘদিনের ‘আলী, কুলি, বঙ্গাল খেদাও’ (মুসলিম, বিহারি ও হিন্দু বাঙালি) স্লোগানে সংগঠিত হলেও বিজেপি সরকার তাকে নতুন সংকটের আবর্তে নিক্ষেপ করছে।’‘যদিও বাংলাদেশ সরকারের কাছে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয় সংকর সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমরা বিস্মিত হয়ে দেখলাম, ভারত সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশ সরকারও এ বিষয়কে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে উল্লেখ করছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের কাছে এটা পরিষ্কার যে, ভারত বন্ধুত্বের কথা বলে বাংলাদেশের কাছ থেকে শুধু সুবিধাই নিয়েছে, বাংলাদেশকে তিস্তার পানিসহ কিছুই দেয়নি। ফলে ভারতের আশ্বাসে বিশ্বাস করার কিছু নেই।’

খালেকুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ সরকারকে ভারতের প্রতি অনুগত না থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এখনই আসামের এনআরসি বিষয়ে সতর্ক থাকা, পুশব্যাকের ভারতীয় নীলনকশা ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবির নজরদারি জোরদার এবং কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর দাবি জানান। তিনি ভারতীয় শাসক গোষ্ঠীর এহেন চক্রান্তের বিরুদ্ধে দেশের সকল বাম প্রগতিশীল জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়ারও আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘পাশের দেশ হিসাবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং তার প্রভাব পরিণতিতে বাংলাদেশে সংকট সৃষ্টির বিষয়ে দেশের শাসকশ্রেণীর আগাগোড়া মনোযোগ না দেয়া এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও প্রতিকারমূলক আগাম প্রস্তুতি না রেখে তাৎক্ষণিক ও এডহক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে সংকটের মাত্রা ও বোঝা দিন দিন বেড়ে চলছে। ২০১৭ সালে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তখন থেকেই বাংলাদেশ সরকারের ভ্রান্ত পররাষ্ট্রনীতি এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে এই সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক কোনো শক্তিকে পাশে পাচ্ছে না।’

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।