বাংলার সূর্য সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ

১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ জাতীয়, সংবাদ শিরোনাম বার পঠিত হয়েছে

ডেস্ক রিপোর্ট :: হাতে পুষ্পাঞ্জলি, আবার অনেকের কাছে রয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে লেখা ব্যানার। অনেকেই নিয়ে এসেছেন লাল-সবুজের বড় ছোট পতাকা। ধীর পদযোগে আগমণ। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেলো বেদি। উদ্দেশ্য একটাই, বাংলার সূর্য সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করা।
এভাবেই আজ শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে ভোর থেকেই রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা জানাতে আসা জনতার ঢল নামে। গানের সুরের মতো তারা বলে ওঠে- ‘তোমাদের কথা রবে সাধারণ মানুষের ভিড়ে…’। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে জনতার স্রোত।

ভোরের প্রথম কিরণ থেকেই জেগে উঠে রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী সমাধিসৌধ। হাজারও মানুষের ঢলে স্মৃতিস্তম্ভের খোলা জানালাও যেনো শ্রদ্ধা জানাচ্ছিল শহীদ বুদ্ধিজীবীদের।
বিজয়ের ঊষালগ্নে তাদের হত্যা করে নব্য স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে চেয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। আর তাদের মদদ দিয়েছিল এ দেশের দোসররা।
শনিবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষ স্মরণ করেন সেসব বীর শহীদকে। শপথ নেয় বুদ্ধিজীবীদের দেখানো পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার। ধিক্কার জানায় তাদের হত্যাকারীদের।
শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ। এছাড়া বুদ্ধিজীবী দিবসের ঠিক একদিন আগে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ বলায় তারা তীব্র নিন্দা জানায় দৈনিক সংগ্রামের প্রতি। সেইসঙ্গে সংগ্রামের প্রকাশনা বন্ধের দাবিও ছিল তাদের কণ্ঠে।
বুকের পাঁজরে থেকে যাওয়া দগদগে ক্ষত নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। শ্রদ্ধা জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীদের সংঘবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান সাংবাদিক-সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারের কন্যা শমী কায়সার।
তিনি বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সঠিক তালিকা করতে হবে। একইসঙ্গে রাজাকারদেরও সঠিক তালিকা করতে হবে।
দৈনিক সংগ্রামের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, যুদ্ধাপরাধীকে শহীদ বলা মানে বাংলাদেশকে অস্বীকার করা। আমাদের বাবাদের হত্যাকারীরা যদি শহীদ হন, তাহলে আমাদের বাবাদের কী রাজাকার বলতে চান? যারা রাজাকারদের শহীদ বলে, তাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব থাকার কথা না। দৈনিক সংগ্রামের প্রকাশক ও সম্পাদককে গ্রেফতার করে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা করে বিচার করতে হবে।
রাজধানীর ঝিগাতলা থেকে আগত গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আদনান ফেরদৌস বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে আমরা। এখন আমরা সঠিক ইতিহাস জানতে পেরেছি। কেউ যদি আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাকে আমরা বর্জন করব।
আদাবরের শামসুল আরেফিন বলেন, বুদ্ধিজীবীরা চলে গেছেন। কিন্তু কর্মের মাধ্যমে তাদের আদর্শ আজও আমাদের কাছে দৃশ্যমান। সে আদর্শেই আমাদের পথ চলতে হবে।
শহীদ পরিবার থেকে শুরু সাধারণ মানুষের এ ক্ষোভের রেশ ছিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, দৈনিক সংগ্রাম আব্দুল কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ বলে ঘৃণ্য কাজ করেছে। একাত্তরে তারা যে ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল, তা অব্যাহত রেখেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। একইসঙ্গে দৈনিক সংগ্রামে বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লাল-সবুজ সাজে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিল আগামী প্রজন্মও। তবে দেশের ইতিহাসের এই কালো অধ্যায় কতটুকুইবা জানে তারা?
তাদের জানানোর দায়িত্ব আগের প্রজন্মের বলে মন্তব্য করে কবি রুবী রহমান বলেন, আমাদের দায়িত্ব নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানো। সেইসঙ্গে তাদের আগ্রহ থাকতে হবে। এছাড়া যাদের আমাদের মাঝ থেকে আমরা হারিয়েছি, তাদের নতুন প্রজন্মের মাঝেই আমাদের খুঁজে ফিরতে হবে।
মোহাম্মদপুর বছিলা বালিকা বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী জিনিয়া বলে, আমরা বইয়ের পাতায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে পড়েছি। তাদের শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। বড় হয়ে আমিও ডা. আলিম চৌধুরীর মতো চিকিৎসক হয়ে দেশের সেবা করতে চাই।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধায় স্মরণ করার মিছিলে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলে শোনা যায় একই কথা- ‘সত্যিকারের স্বাধীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রতিটি নাগরিকের আত্মনিয়োগের মাধ্যমেই কেবল শোধ হতে পারে শহীদদের ঋণ।
বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রায়ের বাজারের বধ্যভূমিতে সকালে মানুষের ঢল নামে। বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে বিটিভির সাবেক ডিজি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মো. হামিদ বলেন, ‘এখনো একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে শহীদ উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করার সাহস রাখে দৈনিক সংগ্রাম। এদের যথাযথ শাস্তি না দিলে যে লক্ষ্যে দেশ স্বাধীন হয়েছে তা পূরণ হবে না।’
ব্যবসায়ী সেলিম রেজা বলেন, ‘ইতোমধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িত অনেকের বিচারের রায় কার্যকরের ফলে স্বস্তি বোধ করছি। তবে এখনও পলাতক রয়েছে অনেকে। তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করতে হবে।’
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দুইদিন আগে বুদ্ধিজীবী হত্যায় প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্যরা। শরীরে নিষ্ঠুর নির্যাতনের চিহ্নসহ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মরদেহ পাওয়া যায় মিরপুর ও রায়েরবাজারে।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।