প্রতি মাসে এক লাখ টাকা করে পাবে যুব ক্রিকেট দল: পাপন ওয়াটার স্যালুটে সিক্ত বীর যুব টাইগাররা

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ আন্তর্জাতিক, খেলাধুলা, শীর্ষ সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম, সারাদেশ বার পঠিত হয়েছে

অনলাইন ডেস্ক:বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিক কোনো সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে না। বিমানবন্দরের পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেই সংবর্ধনা আয়োজন থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত। কিন্তু বললেই কী হয়? এটা আর যে-সে জয় নয়, একবারে বিশ্বজয়। আর সেই জয় অর্জন করে দেশে ফিরছেন বীর যুব টাইগাররা।বুধবার বিকাল পৌনে ৫টায় হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল পৌঁছার আগেই হাজার হাজার ক্রিকেট পাগল জনতা হাজির হয়ে যায় বিমানবন্দরে। ব্যানার, পোস্টার, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন, জার্সি এবং জাতীয় পতাকা হাতে হাজারো ক্রিকেটপ্রেমী বিমানবন্দরে হাজির হয় বিশ্বজয়ী আকবরদের বরণ করে নিতে। কখনো কখনো তারা ‘আকবর, আকবর’ কিংবা ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ আবার জয়বাংলা সেøাগানেও মুখরিত করে তোলে বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকা।

অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলকে বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইনসের ইকে-৫৮৬ নম্বর ফ্লাইট বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের ওয়াটার স্যালুট দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। বিমানটি অবতরণের সঙ্গে সঙ্গে টার্মিনালের সামনে বিমানের দুদিক থেকে পানি ছিটানোর মাধ্যমে এ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বিমানবন্দরের রানওয়েতে পা রাখেন আকবর বাহিনী।  বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এত বড় সাফল্য এর আগে ধরা দেয়নি। মূল ট্রফি না হলেও যুব বিশ্বকাপ। তার ওপর ভারতের মতো পরাশক্তিকে হারিয়ে ট্রফি জয়। ফাইনালে জয়ের টার্গেট বড় না হলেও, একটা সময় মনে হয়েছিল ফাইনালে স্নায়ুচাপ হয়তো সিনিয়রদের মতো যুবারা সামলে উঠতে পারবে না। এর মাঝে অনাহুতের মতো বৃষ্টি। সব প্রতিকুলতা কাটিয়ে শিরোপা জয়। বিশ্বকাপ তো বিশ্বকাপই। সবকিছু মিলিয়ে দেশের ক্রীড়ায় সাফল্য এনে দেয়া ইয়াং টাইগারদের বরণ করতে অপেক্ষায় ছিল পুরো দেশবাসী।

এর আগে বাংলাদেশ জাতীয় দল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে, চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে খেলেছে সেমিফাইনাল। কিন্তু বড়দের দল কখনোই আইসিসির কোনো বৈশ্বিক আসরে ফাইনালে উঠতে পারেনি। যুবারা ফাইনালে তো উঠলোই। প্রথমবারের মতো ওঠেই শিরোপাও হাতে নিল। স্বপ্নের শিরোপা আকবরদের হাতের মুঠোয়।

গতকাল বিকেলে বিশ্বকাপজয়ী বাংলাদেশ যুবদল দেশে ফিরেছে। বিসিবির সিদ্ধান্ত অনুসারে স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে নেওয়া হয় মিরপুরে হোম অব ক্রিকেটে। বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিক কোনো সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে না। বিমানবন্দরের পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেই সংবর্ধনা আয়োজন থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত। এর মধ্যেও ফুলেল সংবর্ধনায় সিক্ত করেছে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও বিসিবি। ক্রিকেটারদের বরণ করে নেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল ও বিসিবি বস নাজমুল হাসান পাপন। বিমানবন্দরে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় পাপন বলেন, আমরা তো এর আগে অনেক কিছু করেছি। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছি, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল খেলেছি। প্রায় সব বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে সিরিজ জিতেছি। এর আগে কখনো হয়নি এগুলো। কিন্তু এটার কাছে সেসব সাফল্য কিছুই না। বিশ্বকাপ, বিশ্বকাপই।

তিনি বিসিবি সভাপতি থাকা অবস্থায় এমন ঈর্ষণীয় সাফল্য এলো। সেদিক থেকে নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতেই পারেন নাজমুল হাসান পাপন। তবে বিসিবি সভাপতি কৃতিত্ব নিজে নিতে রাজি নন। তিনি বলেন, আমার সময় বলে কোনো কথা নয়। এরা ভালো খেলেছে, কার সময় সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যত টুর্নামেন্টই হোক না কেন; দুই বছর বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন থাকবে বাংলাদেশ, এটাই তো শান্তি।

ওয়াটার স্যালুটে বরণ: অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলকে বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইনসের ইকে-৫৮৬ নম্বর ফ্লাইট বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের ওয়াটার স্যালুট দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়। বিমানটি অবতরণের সঙ্গে সঙ্গে টার্মিনালের সামনে বিমানের দুদিক থেকে পানি ছিটানোর মাধ্যমে এ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।

বিশ্বের সব বিমানবন্দরেই বিশেষ কারণে ওয়াটার স্যালুট দেওয়া হয়। এদের বেশির ভাগই আনন্দদায়ক কারণে। সেগুলো হচ্ছে নতুন কোনো এয়ারলাইনস বিমানবন্দরে এলে, বিমানের ক্যাপ্টেন বা সংশ্লিষ্ট কোনো মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তি অবসর গ্রহণ করলে, বিমানবন্দরে কোনো বিমান বা এয়ারলাইনসের শেষ ফ্লাইট হলে, বর্ষবরণ বা যেকোনো উৎসব উদযাপনে, জীবিত বা মৃত কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে বরণ করে নিতে।
ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে বাংলাদেশের নাম তোলা বীরদের ‘রাষ্ট্রের বিশেষ ব্যক্তি’ ধরেই বরণ করে নেয়ার আয়োজন। বিভিন্ন ফুটবল দলকেও সাফল্য অর্জন শেষে দেশে ফেরার পর এমন অভ্যর্থনা দিতে দেখা যায়। ২০১৮ বিশ্বকাপ জয়ী ফ্রান্স ফুটবল দল, ২০১৬ সালে ইউরোপিয়ন চ্যাম্পিয়ন হওয়া পর্তুগালও দেশে ফিরে পেয়েছে ওয়াটার স্যালুট।

এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিমানটিকেও ওয়াটার স্যালুট দেয়া হয়েছিল।
মিরপুরে লালগালিচা সংবর্ধনা: বিশ্বজয়ী আকবর আলিদের বিমানবন্দর থেকে বিশেষ চ্যাম্পিয়ন বাসে নেয়া হয় মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। বিমানবন্দরের মতো মিরপুর স্টেডিয়ামও লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। মিরপুর-১০ নম্বর থেকে ২ নম্বর পর্যন্ত এবং স্টেডিয়ামের সামনের এলাকায় কয়েক হাজার মানুষ ব্যানার, ফেস্টুন, জার্সি এবং জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে অপেক্ষমাণ থাকে বিশ্বজয়ী বীরদের বরণ করে নিতে। কয়েক শ’ মোটরসাইকেলও বাসকে অনুসরণ করে। আকবর আলিদের বাস মিরপুর ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষার অবসান ঘটে অপেক্ষমাণ ক্রিকেট ভক্ত-সমর্থকদের। খেলেয়াড়দের বাসের সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে দর্শকরা প্রবেশ করে স্টেডিয়াম চত্বরে। দর্শকদের জন্য খুলে দেয়া হয় স্টেডিয়ামে গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড গ্যালারির গেট। দর্শকরা সবাই বিশ্বজয়ী বীরদের বরণের জন্য চলে যায় গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডে।

বিসিবি কার্যালয় থেকে স্টেডিয়ামে নেমে আসার পথে আগে থেকেই বিছানো ছিল লাল গালিচা। আন্তর্জাতিক ম্যাচ শেষে যে জায়গায় পুরস্কার বিতরণ করা হয়, সেখানে রাখা ‘ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন’ লেখা ব্যাকড্রপ; যার ঠিক সামনেই টেবিলে সাজানো ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ লেখা কেক। আকবর আলিরা লাল গালিচা দিয়ে সেই জায়গায় পৌঁছার পর আনা হয় বিশ্বকাপের ট্রফিটি। এরপর বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন আর বাংলাদেশ যুব দলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক আকবর আলি একসঙ্গে ট্রফি উঁচিয়ে অংশ নেন ফটোসেশনে। দুই কেকের মাঝখানে রাখা হয় ট্রফিটি। তারপরই কেক কেটে বিজয় উদযাপন করা হয়।

বিশ্বকাপজয়ী যুবাদের মাসে এক লাখ টাকা করে দেবে বিসিবি : মিরপুরে জাতীয় স্টেডিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন পরিকল্পনার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘এই দলটিকে সম্পূর্ণ ইনট্যাক্ট রাখা হবে অনূর্ধ্ব-২১ দল হিসেবে। তাদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কোচিং স্টাফ এবং সর্বোচ্চ প্র্যাকটিস ফ্যাসিলিটি নিশ্চিত করা হবে। যত রকমের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা দেয়া যায়, তার সবই দেওয়া হবে। আগামী দুই বছর একসঙ্গে রেখে ট্রেনিং দেওয়া হবে এবং এই পরবর্তী দুই বছর, প্রতি ক্রিকেটারকে মাসে এক লাখ টাকা করে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। দুই বছর পর পারফরম্যান্স বিবেচনা করে নতুন সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।’

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেছেন, আমরা ঠিক করেছি অনূর্ধ্ব-২১ দল গঠন করব। আর এই দলে সুযোগ পাবে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের ক্রিকেটাররা। ওদের আমরা দুই বছরের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করব। এই দুই বছর এই দলের ক্রিকেটাররা প্রত্যকে মাসে এক লাখ টাকা করে পাবে।

বিসিবি সভাপতি আরও বলেন, আমরা দেখব তারা যদি উন্নতি করতে পারে তাহলে চুক্তিতে থাকতে পারবে, না হয় বাদ পড়ে যাবে। এদের উন্নয়নে যত প্রকার সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায় আমরা তা-ই কবর।

দক্ষিণ আফ্রিকার বৈরী কন্ডিশনে শক্তিশালী ভারতকে তিন উইকেটে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে প্রথম শিরোপা জয় করা যুবাদের নিয়ে পাপন বলেন, ওরা আমাদের গৌরব, তারা বিশ্বকাপ জয় করে এসেছে। বিশ্বকাপ জেতা অনেক কঠিন কাজ। তবে এখান থেকে সামনে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অনেক অনেক কঠিন। আমি ওদের বলেছি আর্থিক বিষয়গুলো নিয়ে তোমাদের কোনো চিন্তা করার কিছু নেই।

বিসিবি সভাপতি আরও বলেন, আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটারদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সংবধর্না দেবেন। ক্রিকেটাররা আগামীকাল (আজ) বাড়িতে যাবে। ওরা যাতে সুন্দরভাবে বাড়িতে পৌঁছতে পারে সে জন্য আমরা সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।