দুর্গাপূজা ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতি

৪ অক্টোবর ২০১৯ বিশেষ প্রতিবেদন, মুক্ত মতামত, লাইফ স্টাইল, শিল্প ও সাহিত্য বার পঠিত হয়েছে

চৌধুরী ভাস্কর হোম:
প্রকৃতিতে চলছে রূপান্তরের খেলা। আশ্বিনের শেষে এই মেঘ এই রোদের খেলায় দুলে উঠছে কাশবন। এ যেন শরতের প্রতীক। এই শরতেই বেজে উঠছে উৎসবের বাদ্য। শারদীয় উৎসব। ঢাকের বাদ্যিতে ছড়িয়ে পড়ছে উৎসবের আমেজ। মানুষে মানুষ, জীবনে জীবন যোগ করার আবাহন নিয়ে উৎসব এসে কড়া নাড়ছে। বেজে উঠছে সুরের সম্মিলিত ঐকতান। উৎসব মানে মহামিলনের দিগন্তকে প্রসারিত করে তোলা। পর¯পরের সঙ্গে প্রাণে প্রাণ মেলানোর এক মোক্ষম আয়োজন ঘটে উৎসবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবশ্য এই প্রাণের উৎসবকে গুরুত্ব দিয়েছেন তার সময়কালে। বলেছেন, সবচেয়ে দুর্গম- যে মানুষ আপন-অন্তরালে,/তার পূর্ণ পরিমাপ নাই বাহিরের দেশে কালে।/সে অন্তরময়/অন্তর মিশালে তবে তার অন্তর পরিচয়।/ উৎসবের যেমন রয়েছে বহিরঙ্গ, তেমনি তার অন্তরঙ্গেও রয়েছে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, যন্ত্রণার সারাৎসারও। সম্ভবত এরা মানুষের ভেতরই সৃষ্ট এবং তাতেই পায় লয়। উৎসবের সঙ্গে চিত্তবিত্তের একটা পার¯পরিক স¤পর্ক রয়ে যায়। সমাজের উচ্চ ও নীচ শ্রেণীর মধ্যে উৎসবের আনন্দ একরূপে প্রতিভাত হয় না। নি¤œ অনাহারী অসহায় মানুষের জীবনে উৎসব হচ্ছে সেই দিন, যেদিন সে দুবেলা দুমুঠো খাদ্য পরিপূর্ণতার সঙ্গে ধারণ করতে পারে। সামাজিক বৈষম্যের করুণ রূপটি উৎসবের দিনে সাদা চোখে তাকালে ¯পষ্ট হয়। একদল উৎসবকে সামনে রেখে দেদার ব্যয় করেন। আরেক দল অর্থাভাবে উৎসবে শামিল হওয়ার আয়োজনটুকুও স¤পন্ন করতে পারে না। প্রাণে প্রাণ যোগ হওয়ার ক্ষেত্রগুলো হতে থাকে কেবলই সঙ্কুচিত। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত স্তরে উৎসবের রং একরকম নয়। অর্থ, বৈভব, প্রতিপত্তির দাপটে উৎসব নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে তাদেরই হাতে। অন্যরা দর্শক হয়ে উপভোগের আত্মরক্ষায় শামিল হলেও ভেতরের দারির্দ্য তাকে পীড়িত করে তোলে। শ্রেণীতে শ্রেণীতে বৈষম্য কতদূর বিস্তৃত উৎসবে তা দৃষ্টিগোচর হয় এদেশে-ওদেশে।
অন্ধকারের শক্তিকে নিধন, অন্যায়-অবিচারের অপশক্তি ও বর্বর শক্তিকে সংহার করে আলোকিত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এ ধরনের ধর্মীয় উৎসব শুধু বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্যই নয়; সব সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির মেলবন্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরমতসহিষুষ্ণতা প্রদর্শনের মাধ্যমে ধর্মের রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির প্রতি পার¯পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান প্রদান ও এ ধারণাকে মর্যাদাসীন করার লক্ষ্যে মানবিকতায় উজ্জীবিত চেতনার নামই অসাম্প্রদায়িকতা। এই জনপদে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ ও সাবলীল বসবাস এই জাতির ঐতিহ্য-কৃষ্টির উৎকৃষ্ট পরিচায়ক। এই বাংলা ভূখন্ডে প্রত্যেক ধর্মের বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর এ ধরনের ঈদ-রোজা-মহররম-পূজা পার্বণ-বড়দিন-বৌদ্ধ পূর্ণিমার সমীকরণে স্বজাত্যবোধের পরিচিতি অত্যন্ত নন্দিত ও প্রশংসিত। এ অঞ্চলের সমগ্র মানবগোষ্ঠীর প্রকৃত উপলব্ধি হলো- এই দেশ আমার; এই ভাষা সংস্কৃতি, লোকাচার, কৃষ্টি সবকিছুই আমার। আমি এই দেশের বাঙালি সন্তান এবং ধর্মবিশ্বাসে কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান; কেউবা বৌদ্ধ, কেউবা খ্রিস্টান। জাতিগতভাবে বাঙালি ধর্মবিশ্বাসে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান হয়ে দল বেঁধে মসজিদ-মন্দির-গির্জায় যাওয়া, যে যার ধর্ম মতো উপাসনা করা, মুরব্বিদের আশীর্বাদ নেওয়ার বিভিন্ন ধর্মীয় প্রক্রিয়া যেমন চলমান, তেমনি অমর একুশে, স্বাধীনতা, বিজয় দিবস উদযাপন, পহেলা বৈশাখ উদযাপন, রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তজয়ন্তী উদযাপন, নববর্ষে হালখাতা, বসন্তের আগমনে কপালে টিপ দিয়ে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা, কবিতা ও ছড়া পাঠের আসর, পিঠা উৎসব, উৎসব-পার্বণে আলপনা আঁকা, বিয়ের অনুষ্ঠানে গায়ে হলুদ ও গান-বাজনা, বধূবরণ, চৈত্রসংক্রান্তি, পূজা-মেলা ইত্যাদি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সব ধর্ম-বর্ণ-গোত্রভেদে সার্বজনীন মানবতায় উজ্জীবিত সংস্কৃতিই বাংলাদেশের সংস্কৃতি, বাঙালি সংস্কৃতি। এরই সাবলীল ধারায় দেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাইকে এক করে স্বাধীন স্বদেশভূমির অপরূপ সংস্কৃতির বিকাশ উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হচ্ছে।
অশুভ শক্তি দমন করে বাসযোগ্য সম্প্রীতিতে পূর্ণ একটি সুন্দর সমাজ গড়ে উঠুক এই বাংলাদেশে, সেই প্রার্থনা ছড়িয়ে পড়–ক সর্বত্র। মানবিকতার সকল দুয়ার খোলা থাক, সম্প্রীতির আলোকমালা ছড়িয়ে পড়–ক, মানুষে মানুষে বন্ধন হোক দৃঢ়। আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ করুক স্বপ্ন সুন্দর। কল্যাণের গান ধ্বনিত হোক উৎসবের আবরণে। অশুভ শক্তির হোক বিনাশ। মানুষে মানুষে সম্প্রীতি থাক অমলিন।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।