“দশই মহররম- মহা পবিত্র আশুরাঃ জং-এ-কারবালার শিক্ষাঃ আমাদের দিক্ষা 

৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ধর্ম ও জীবন, পরিবেশ ও পর্যটন, প্রচ্ছদ, ফিচার ও কলাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বিশেষ প্রতিবেদন, ময়মনসিংহ, মুক্ত মতামত, মৌমাছি কন্ঠ পরিবার, মৌলভীবাজার, রাজনীতি, লাইফ স্টাইল, শিক্ষা-ক্যাম্পাস, শীর্ষ সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম, সারাদেশ, সিলেট বার পঠিত হয়েছে
মুজিবুর রহমান মুজিব
মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও অগ্রাভিযানের ইতিহাসে ৬১ হিজরির দশই মহরম এর জং-এ-কারবালা-কারবালার অসম যুদ্ধ সব চাইতে দুঃখ, বেদনা ও হৃদয় বিদারক ঘটনা। ফোরাত নদীর তীরে- কারবালার প্রান্তরে মহান আল্লাহর প্রিয় হাবীব আমাদের পিয়ারা নবী, মহা মানব মোহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-র প্রিয় দৌহিত্র, শেরে খোদা হযরত আলী এবং মা ফাতেমার পুত্র বেহেশত এর যুবকদের সর্দার হযরত ইমাম হোসেইন (রঃ) সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য এজিদ বাহিনীর হাতে স-পরিবারে শাহদাত বরণ করেন। হযরত ইমাম হোসেইন বিশাল ইসলামী সা¤্রাজ্যের ক্ষমতার অংশীদার হতে চান নি কিংবা ইয়াজিদ এর সরকারে ঐক্যমতের অংশীদার হতে চান নি, সত্য ও ন্যায় ইমান আমল ও ইনসাফের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, নিষ্টুর ইয়াজিদ বাহিনীর কাছে মস্তক অবনত করতঃ আত্মসমর্পন করেন নি, আত্ম বলিদান করেছেন। যে সুবিশাল ইসলামী সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তারই প্রিয় নানাজান, ইসলাম ধর্মের প্রচারক আদর্শ রাষ্ট্র নায়ক হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সঃ) সেই ইসলামী সা¤্রাজ্যের একজন ইসলাম বিরোধী শাসক ইসলামী রীতিনীতি -কোরানী-কানুনের পরিবর্তে মহানবী প্রদর্শিত পথ পরিহার করে একনায়কতন্ত্রী, স্বৈরাচারী পন্থায় নিজস্ব খেয়াল খুশী মত রাজ্য শাসন ও রাজ্য পরিচালনায় মনযোগী হয়ে উঠেন। উষর মরুর ধূষর দেশে ইসলামী সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে আদর্শ মানব মহানবী মোহাম্মদ (সঃ) কোরানিক কানুন-আল্লাহর আইন মোতাবেক রাজ্য পরিচালনা করেছেন। মহানবীর মহা প্রয়ানের পর খোলাফায়ে রাশেদীন-ইসলামের চার খলিফা আল্লাহর আইন ও নবীর সুন্নাহ-মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করে শুধু মাত্র আরবের ইতিহাস নয় পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্ম ও মানব সেবায় উজ্জল উদাহরণ স্থাপন করতঃ অমর হয়ে আছেন। মানব সভ্যতার সেই মধ্য যুগে আইন সভা ও জনপ্রতিনিধিত্ব না থাকলেও সু-শাসন ও ন্যায় বিচার ছিল। খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে মুসলিম জাহান প্রজা পালন করতেন, মজলিশ-ই-সুরা- পরামর্শ দাতার পরামর্শ মোতাবেক উত্তরাধিকার তন্ত্রের চাইতে জনমতকে গুরুত্ব দেয়া হত। দশম শতাব্দী থেকে দিল্লীর সুলতান গন রাজ্য পরিচালনায় চিহালগনী- এবং প ম শতাব্দী থেকে সর্ব ভারতীয় মুগল স¤্রাটগণ আমীর ওমরাহদের পরামর্শ নিতেন। ইসলামী সা¤্রাজ্যের মজলিশই শুরা একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছিল। শুরাকে আধুনিক জমানার এভাইজার কিংবা কেবিন্যেট মিনিষ্টার্স এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে যদিও ধর্মীয় ও ঐতিহ্য গত ভাবে শুরার সম্মান ও মর্য্যাদা সর্বাধিক। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী পর্য্যন্ত শুরা-খলিফা নির্বাচন ও রাজ্য পরিচালনায় ঐক্য মতের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ ভাবে গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শের এখোদা মহাবীর হযরত আলীর শাসনামলে বিভিন্ন কিৎনা ও মত পার্তক্য সৃষ্টি হয়। একটি কুচক্রীমহলে নবী বংশকে নির্বংশ করার পায়তারা করতে থাকে তাঁরই ফলশ্রæতিতে মহানবীর দৌহিত্র, আলী-ফাতেমার প্রিয় পুত্র ইমাম হাসান (রঃ)-কে বিষ প্রয়োগে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। হযরত আলী ইন্তিকালের পর মজলিশই শুরা ঐক্যমতের ভিত্তিতে নবীর প্রিয় সাহাবী ও হাদীস সংগ্রাহক হযরত মা-বিয়াকে ইসলামী সা¤্রাজ্যের আমীর নির্বাচিত করা হয়। ইমাম হোসেইন তখন বায়োঃ কনিষ্ট। অনেকেরই মনোভাব ছিল হযরত মাবিয়ার পর ইমাম হোসেইন হবেন ইসলামী সা¤্রাজ্যের খলিফা-আহলে বায়াইত এর হাতে আসবে ইসলামী সা¤্রাজ্যের শাসনভার, কিন্তু দুঃখ ও দূর্ভাগ্যজনক ভাবে তা আর হয় নি। বিশ বৎসর খলিফা হিসাবে রাষ্ট্র পরিচালনার পর ষাট হিজরিতে আমীর মাবিয়া ইন্তিকাল করলে তাঁর পুত্র নিষ্টুর ইয়াজিদ মুসলিম সা¤্রাজ্যের খলিফা বলে নিজেকে ঘোষনা দিলে মুসলিম জাহানে মত পার্থক্য দেখা দেয়।  আমীর মাবিয়ার জিবীতবস্থায় কতেক শুরাও আমীর ওমরাহদের মতামত নিয়ে নিজ পুত্রকে প্রতিনিধি ঘোষনা করে গিয়েছিলেন। মদীনা ইরাকের একাংশ বিশেষত কুফা অ লের লক্ষ লক্ষ নবী ভক্ত মুসলিম সমাজ ইমাম হোসেইন-কে মুসলিম জাহানের খলিফা নির্বাচিত করার দাবী জানান। বিশেষতঃ মদীনাতুন্নবী মদীনা মনোয়ারার মুমিন মুসলমানগণ এক বাক্যে নবী দৌহিত্রকে খলিফা বলে ঘোষনা করেন। এমতাবস্থায় ইরাকের কুফা থেকে ইমাম হোসেনকে মুসলিম জাহানের খলিফা হিসাবে দেখতে চান, তারা তাঁর কাছে বইয়াত হতে চান। একজন নিজস্ব দূত মারফত কুফার অবস্থা জেনে পরিস্থিতি অনুকুল বিবেচনায় ইমাম হোসেন বিসমিল্লা বলে তার পরিবারের ১৯ জন সদস্য সহ মোট একাত্তোর জন সঙ্গীঁ নিয়ে কুফার উদ্দেশ্যে মদীনা ত্যাগ করেন। এই সংবাদ প্রাপ্ত হয়ে নিষ্টুর ইয়াজিদ কুফার গভর্নর নোমান ইবনে বশীরকে পদচ্যোত করে তাঁর একান্ত অনুগত ওবায়দুল্লাহ বিনজিয়াদকে কুফার গভর্নর নিয়োগ করতঃ তাঁকে নির্দেশে দেন কোন অবস্থায়ই ইমাম হোসেন যেন কুফায় প্রবেশ করতে না পারেন। এজিদ অনুগত জিয়াদ কুফায় গভর্নরের দায়িত্ব ভার নিয়েই কঠোর হস্তে এজিদ বিরোধী জনগণকে দমন করেন, হোসেনের দূত ও আত্মীয় মুসলিম বিন আকিলকে নির্মন ভাবে হত্যা করেন। ইমাম হোসেনকে প্রতিরোধ করার জন্য চার হাজার সৈন্যের একটি শক্তিশালী বাহিনী কারবালার ময়দান অভিমুখে প্রেরণ করেন। ইয়াজিদ বাহিনী কারবালার প্রান্তরে এসে ফোরাত নদীর তীরে অবস্থান নেয়। ইমাম বাহিনীকে অবরুদ্ধ ও ঘেরাও করে। ইমাম হোসেইন (রাঃ) অবরোধ কারীদের উদ্দেশ্য করে বলেন তিনি যুদ্ধ করতে আসেন নি, এসেছেন কুফা বাসীর আমন্ত্রনে, তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁদেরকে নেতৃত্ব দিতে। পরিবার সদস্যদের পানির প্রয়োজনে ফোরাত কুল অবরোধ প্রত্যাহার করতে আবেদন জানান ইমাম হোসেইন। ইমামের অনুরোধ এবং শান্তির স্বপক্ষে বিনয় ভাষন উপেক্ষা ও অমর্য্যাদা করে ইয়াজিদ প্রতিনিধি ইবনে জিয়াদ নিঃশর্ত আত্ব সমর্পন করে তাঁর হাতে ইমামকে আনুগত্যের শপথ নিতে আদেশ দেয়। নবী দৌহিত্র, মহাবীর হযরত আলীর পুত্র মা ফাতেমার নয়নের মনি-কলিজার টুকরা হযরত ইমাম হোসেইন (রাঃ) ঘৃনা সহকারে ইবনে জিয়াদের যাবতীয় প্রস্তাব ও শর্ত প্রত্যাখ্যান করতঃ মানষিক ভাবে জিহাদের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। কারবালার নির্জন প্রান্তরে ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর ইমাম পরিবারের সদস্য ও সহচরগণ। অবশেষে দশই মহররম সকালে ইবনে জিয়াদ ইমাম হোসেন ও তাঁর পরিবার বর্গের উপর আক্রমণ চালাতে থাকে। ফোরাত নদী থেকে ইমাম বাহিনীর পানি আনাও বন্ধ করে দেয়া হয়। দশই মহররম ৬১ হিজরিতে মানব ইতিহাসের সব চাইতে করুন বেদনাদায়ক ও অসমযুদ্ধ অনুষ্টিত হয়। ইবনে জিয়াদ এর চার সহ¯্রাধিক সশস্ত্র সৈন্যের সঙ্গেঁ বীর দর্পে যুদ্ধ করে সকলেই শহীদ হন, ইমাম জয়নুল আবেদীন ছাড়া। সিনান বা শিমার নামক এক মহাপাপিষ্ট পাষন্ড ইমাম হোসেইনকে শিরোচ্ছেদ করে। কারবালার প্রান্তরে ধ্বনিতে হতে থাকে হয়ে হোসেন। হায় হোসেন।
সত্য ও ন্যায়ের স্বপক্ষে আত্ব ত্যাগ ও আত্ব বলিদান করে হযরত ইমাম হোসেন মানব ইতিহাসে সত্য, ন্যায়, ইমান, ইনসাফের এক উজ্জল উদাহরণ রেখে গেলেন। বিশাল ইসলামী সা¤্রাজ্যের বিভক্তি ক্ষমতার অংশীদার হয়ে পাপিষ্ট ইয়াজিদের সঙ্গেঁ মিলে মিশে তথা ঐক্যমতের সরকারে শরীক হতে চান নি ইমাম হোসেইন। ন্যায় ও ইনসাফের জন্য নিজ জীবন উৎসর্গ করেছেন তিনি। পাপি কুচক্রীমহল মহানবীর বংশ নির্বংশ করতে চেয়েছিল, কিন্তু মহান আল্লাহর অপার মেহের বানী, কুদরত, মারিফত ও রহমতে ইমাম জয়নুল আবেদীন বেচেঁ যান। ইরাক-সিরিয়া-দামেস্কে তাঁর অধঃস্তন বংশধরগণ বিদ্যমান ছিলেন-আছেন। ইমাম হোসেনের অধঃস্থন বংশধরগণ অনেকে সৈয়দ, মীর পদবী ধারন করেন। ইরাকি ও নজফি মীর ও সৈয়দ বংশীয়গণ সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ। নাম হিসাবে এজিদ-সীমার অত্যন্ত ঘৃণিত। নিন্দিত। নিষ্টুর নেমক হারামের আরেক নাম এজিদ-সীমার।
দশই মহররম শুধু জং-এ-কারবালা নয় আরো তাৎপর্য্য ও মর্তবা আছে এই দিনে। দিনটি অত্যন্ত পবিত্র। স্বয়ং মহানবী আশুরার দিন নফল এবাদত হিসাবে রোজা রাখতেন। প্রাক ইসলামিক এ্যরাবিয়াতে ও দশই মহররম নফল রোজা রাখার প্রচলন ছিল। উম্মতে মোহাম্মদী আশুরা উপলক্ষ্যে দুইট রোজা রাখেন।
দশই মহররম উপলক্ষে বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মায় হায় হোসেইন হায় হোসেন বব উঠে। শিয়া সম্প্রাদায় দিবসটিকে অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়ে তাজিয়া মিছিল বের করেন। হায় হোসেইন, হায় হোসেইন বলে মাতম করেন-শরীরে রক্ত ঝরান।
দশই মহররম মহা পবিত্র আশুরার দিনে কারবালার বীর শহীদানের অমর উজ্জল স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সালাম জানাই। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর কোরআন ও নবী প্রদর্শিত পথে চলার-সত্য কথা বলার তৌফিক এনায়েত করুন এই মোনাজাত সহ আমীন-ছুম্মা আমীন।
[ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক কলেজ শিক্ষক। মুক্তিযোদ্ধা। সেক্রেটারি জেলা জামে মসজিদ, মৌলভীবাজার। সাবেক সভাপতি, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব]
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।