আত্মহত্যা মানে নিজে নিজেকে শাস্তি দেওয়া

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ধর্ম ও জীবন বার পঠিত হয়েছে

ফয়জুর রহমান শেখ:  আত্মহত্যা মহাপাপ। এ আত্মহত্যা দুর্বল লোক ছাড়া কেউ করে না। যার ঈমানের কমতি আছে, সেই আত্মহত্যা করে। যার ধৈর্যের ক্ষমতা নেই এবং ধৈর্য ধারণ করতে পারে না তারাই এটা করে। অথচ আল্লাহ তায়ালা আমাদের বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করার কথা বলেছেন। ‘ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা কোনো বিপদ এলে ধৈর্য ধারণ করে এবং এ কথা বলে যে, আমরা অবশ্যই আল্লাহ তায়ালার জন্য। তাঁর কাছেই ফিরে যাব। তাদের ওপর তাদের রবের পক্ষ থেকে রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। তারাই হলো হেদায়েতপ্রাপ্ত।’ (সূরা বাকারা : ১৫৭-১৫৫)। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তাকে ধৈর্য ধারণের শক্তি দান করেন। আর যে আল্লাহ তায়ালার রাস্তায় ভালো কিছু দান করে এবং ধৈর্যধারণের চেষ্টা করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে উত্তম বিনিময় দান করেন।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
আত্মহত্যাকারী আল্লাহ তায়ালার ওয়াদাকে সত্য মনে করে না। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেনÑ ‘প্রত্যেক কষ্টের পরে সহজতা রয়েছে। দুঃখের পরে সুখ রয়েছে।’ (সূরা ইনশিরাহ : ৫-৬)। আর সে রাসুল (সা.) এর কথার ওপরও বিশ্বাস করেনি। তিনি বলেছেনÑ ‘জেনে রাখো! আল্লাহর সাহায্য ধৈর্যের সঙ্গে। বিপদের পরই প্রশস্ততা। আর প্রত্যেক কষ্টের পরই সুখ।’ (মুতাদরাক হাকেম)।
যে আত্মহত্যা করে, সে যদি বুঝত, তাহলে নিজেকে হেফাজত করত। আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো বিপদ দেন এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালা বান্দার কল্যাণ ছাড়া কিছুই চান না। সুতরাং কেন আত্মহত্যা? আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেনÑ ‘মোমিনদের ওপর বিপদাপদ লেগেই থাকবে। তার নিজের ওপর, তার সন্তান ও ধনসম্পদের ওপর। যতক্ষণ না সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। এতে তার কোনো অপরাধ নেই।’ (তিরমিজি)।
হায়! যদি আত্মহত্যাকারী বুঝত। আর এই যে অপরাধ। কেয়ামতের দিন তার ওপর অশুভ পরিণতি ডেকে আনবে। ভয়াবহ আজাব নেমে আসবে। আত্মহত্যার মৃত্যু অশুভ পরিণতির আলামত। (নাউজুবিল্লাহ)। কারণ যে ব্যক্তি যা দ্বারা মৃত্যুবরণ করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে ওই অবস্থায় উঠাবেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেনÑ ‘যে যে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে ওই অবস্থায় উঠাবেন।’ (মুসনাদ আহমাদ)।
সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে ইন্তেকাল করবে তাকে এর ওপরই উঠাবেন। আর যে গোনাহের ওপর মৃত্যুবরণ করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে ওই অবস্থায় উঠাবেন। (নাউজুবিল্লাহ)। আর যারা আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে ইন্তেকাল করবে তাদের অবশ্যই কেয়ামতের দিন ওই অবস্থায়ই উঠানো হবে। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে হজ করছিল। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, ওই লোকটি উট থেকে পড়ে আঘাতপ্রাপ্ত হলো। এতে সে ইন্তেকাল করল। রাসুল (সা.) বললেনÑ ‘তাকে পানি দিয়ে গোসল দাও। তাকে তার দুই কাপড়ে কাফন দাও। তাকে সুগন্ধি দিও না। তার মাথা ঢেকে দিও না। কারণ তাকে কেয়ামতের দিন ইহরাম পরা অবস্থায় উঠানো হবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
আত্মহত্যাকারী খারাপ এবং মন্দ অবস্থায় তার জীবনের সমাপ্তি টানে। (নাউজুবিল্লাহ) তাকে কেয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠানো হবে, দুনিয়ায় যা দ্বারা নিজেকে হত্যা করেছে। ওখানে সে সেভাবেই নিজেকে হত্যা করতে থাকবে। হাদিসে এ ধরনের একটি লোকের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সাহল ইবনে সাদ (রা.) এ ঘটনা বর্ণনা করেন। রাসুল (সা.) ও মোশরেকরা মুখোমুখি হলো। যুদ্ধ শুরু হলো। রাসুল (সা.) যখন শত্রুদের প্রতি আক্রমণ করলেন, প্রতিপক্ষও আক্রমণ করল। তখন দেখা গেল সাহাবিদের মধ্যে একজন তুমুল যুদ্ধ করছেন। কোনো কিছুই তাকে বাধা দিতে পারছে না। কোনো তরবারির আঘাতে তিনি ভয় করছেন না। যে-ই সামনে আসে তাকে তরবারি দিয়ে শেষ করে দিচ্ছেন। সাহাবায়ে কেরাম এ অবস্থা দেখে বলতে লাগলেন, আজ আমাদের মধ্যে একজন কতই না সাহসিকতা দেখাচ্ছে। রাসুল (সা.) এ কথা শুনে বললেন, নিশ্চয়ই সে জাহান্নামি। এ কথা শুনে অনেকে হতবাক। সাহাবাদের মধ্য থেকে একজন বললেন, আমি অবশ্যই তার সঙ্গে থাকব। তাকে লক্ষ করব। তিনি বলেন, আমি তার পিছু নিলাম। যখন দাঁড়ান আমিও দাঁড়াই। তিনি যখন দৌড়ান আমিও দৌড়াই। এক পর্যায়ে তিনি আহত হলেন। প্রচ- আঘাত পেলেন। তাতে তিনি মৃত্যু কামনা করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে স্বীয় তরবারি মাটিতে গেঁড়ে দিলেন। নিজের বুক ও পেটের মাঝে তরবারির ফলা ঢুকিয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। ওই সাহাবি রাসুল (সা.) এর কাছে এসে বললেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসুল। আপনি যার কথা বলেছেন, সে জাহান্নামি। আমি তাকে দেখেছি সে ওরকমই। যদিও অধিকাংশ মানুষ তাকে জান্নাতি বলে ধারণা করেছিল। আমি তখন থেকে তার পেছনে লেগে ছিলাম। তার অনুসন্ধানী ছিলাম। সে যখন জখম হলো, আমি দেখলাম সে মৃত্যুকে দ্রুত কামনা করছে। সে তার তরবারি মাটিতে গেঁড়ে নিজের বুকের মাঝে ঢুকিয়ে দিয়েছে। তার ওপর নিজের শরীরের ভার ছেড়ে দিল এবং মৃত্যুবরণ করল। ঘটনা শুনে রাসুল (সা.) বললেনÑ ‘কিছু লোক থাকে, যারা বাহ্যিকভাবে জান্নাতের কাজ করে। আসলে সে জাহান্নামি। আর কিছু লোক থাকে, যারা জাহান্নামের কাজ করে অথচ তারা জান্নাতি।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
কেয়ামতের দিন আত্মহত্যাকারীকে তার আত্মহত্যার বস্তু দিয়ে শাস্তি দেওয়া হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন ‘যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে কেয়ামতের দিন এভাবেই পাহাড় থেকে পড়বে এবং আত্মহত্যা করতে থাকবে। আর যে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করবে তাকে বিষের বোতল দেওয়া হবে। সে সর্বদা বিষ খেতে থাকবে। আর যে কোনো চাকু, ছুরি কিংবা লোহা জাতীয় জিনিস দ্বারা আত্মহত্যা করবে কেয়ামতের দিন সে তার হাতে নিজের পেটে তা ঢুকাতে থাকবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
আত্মহত্যাকারীর ওপর আল্লাহ তায়ালার অভিশাপ। আত্মহত্যাকারীদের বেশিরভাগ অবস্থা হলো তারা আল্লাহ তায়ালার ফয়সালার ওপর নারাজ থাকে। সর্বদাই ক্রোধান্বিত। এ বিষয়টি আনাস ইবনে মালেক (রা.) রাসুল (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘বিশাল প্রতিদান বড় ধরনের বিপদের পরই। আল্লাহপাক যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তাদের বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। যে এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করবে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। আর যে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবেন।’ (ইবনে মাজাহ)।
আমাদের জীবনের মালিক আমরা নই। একে নাশ বা বধ করার অধিকার আমাদের নেই। এজন্য আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন ‘তোমরা নিজেদের নিজেরা হত্যা করো না। আল্লাহপাক তোমাদের প্রতি খুবই দয়াশীল। আর যে ব্যক্তি শত্রুতাবশত এবং বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হয়ে এ কাজটি করবে, আমি অবশ্যই তাকে জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ করব। আর এটা আল্লাহর জন্য অনেক সহজ।’ (সূরা নিসা : ২৯-৩০)।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।